Monday, July 4, 2011

বাদশাহ নাজাশী ও জাফর বিন আবু তালিব


السلام عليكم

দৈনন্দিন পথনির্দেশিকা
বাদশাহ নাজাশী ও জাফর বিন আবু তালিব

মক্কার কুরাইশরা প্রথম থেকেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা) কে ভীষণ কষ্ট দিতে লাগল। তিনি ইসলাম প্রচার শুরু করলে তাঁর উপর নেমে এল সীমাহীন অত্যাচার। ক্রমেই বেড়ে চলল এ নিপীড়ন। নবীর (সা) অনুসারীরাও বাদ গেলেন না। তারাও কাফেরদের নির্যাতনের শিকার হলেন।

সেই অত্যাচার ছিল নানা ধরনের। অনেকটা কঠিন, পাশবিক। এসব নির্যাতন সহ্য করা এক সময় কঠিন হয়ে পড়ল। এমন কঠিন সময় নবী (সা) তাঁর অনুসারীদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা হাবশায় চলে যাও। কেননা, সেখানে এমন একজন ভাল বাদশাহ আছেন। তার রাজত্বে কারো উপর জুলুম হয় না। যতদিন না বিপদ কাটে ততদিন সেখানে কাটাও। নিশ্চয়ই কঠিন সময় একদিন শেষ হবে।’

মহানবীর (সা) নির্দেশে ১১ জন পুরুষ এবং ৪ জন মহিলার একটি ছোট্ট দল গোপনে আবিসিনিয়ায় গমন করল। এ খবর কুরাইশদের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল।

হাবশায় গিয়ে যাতে মুসলমানগণ শান্তিতে থাকতে না পারে, সেজন্য কুরায়েশ নেতারা তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র করল। এ উদ্দেশ্য সফল করার জন্য তারা কুশাগ্রবুদ্ধি কুটনীতিবিদ আমর ইবনুল ‘আছ এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবী রাবী‘আহকে দায়িত্ব দিল। এ দু’জন পরে মুসলমান হন। ১ম জন ৭ম হিজরীর প্রথম দিকে এবং ২য় জন ৮ম হিজরীর মক্কা বিজয়ের পর।

আব্দুল্লাহ ছিলেন আবু জাহলের বৈপিত্রেয় সহোদর ভাই। নাম ছিল বুহায়রা (بحيرى)। ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার নাম রাখেন ‘আব্দুল্লাহ’ (ইবনু হিশাম)। তারা মহামূল্য উপঢৌকনাদি নিয়ে হাবশা যাত্রা করেন এবং সেখানে গিয়ে প্রথমে খৃষ্টানদের নেতৃস্থানীয় পাদ্রী ও পোপদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাদের ক্ষুরধার যুক্তি এবং মূল্যবান উপঢৌকনাদিতে ভুলে দরবারের পাদ্রী নেতারা একমত হয়ে গেল। পরের দিন আমর ইবনুল ‘আছ উপঢৌকনাদি নিয়ে বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হলেন।

অতঃপর তারা বললেন, ‘হে বাদশাহ! আপনার দেশে আমাদের কিছু অজ্ঞ-মূর্খ ছেলে-ছোকরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। যারা তাদের কওমের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে এবং তারা আপনাদের ধর্মেও প্রবেশ করেনি। তারা এমন এক নতুন দ্বীন নিয়ে এসেছে, যা আমরা কখনো শুনিনি বা আপনিও জানেন না। আমাদের কওমের নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে আপনার নিকটে পাঠিয়েছেন, যাতে আপনি তাদেরকে তাদের কওমের কাছে ফেরৎ পাঠান’। তাদের কথা শেষ হ’লে উপস্থিত পাদ্রীনেতাগণ কুরায়েশ দূতদ্বয়ের সমর্থনে মুহাজিরগণকে তাদের হাতে সোপর্দ করে দেওয়ার জন্য বাদশাহকে অনুরোধ করল।

তখন বাদশাহ রাগতঃ স্বরে বললেন, আল্লাহর কসম! এটা কখনোই হ’তে পারে না। তারা আমার দেশে এসেছে এবং অন্যদের চাইতে আমাকে পছন্দ করেছে। অতএব তাদের বক্তব্য না শুনে কোনরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ফলে তাঁর নির্দেশক্রমে জা‘ফর বিন আবু তালিবের নেতৃত্বে মুসলিম প্রতিনিধি দল বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম দিলেন। কিন্তু সিজদা করলেন না।

বাদশাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা প্রথানুযায়ী আমাকে সিজদা করলে না কেন? যেমন ইতিপূর্বে তোমাদের কওমের প্রতিনিধিদ্বয় এসে করেছে? বাদশাহ আরও বললেন, বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে এমনকি আমাদের ধর্ম গ্রহণ না করে নতুন যে ধর্মে তোমরা দীক্ষা নিয়েছে, সেটা কী আমাকে শোনাও!’

জা‘ফর বিন আবু তালিব বললেন, হে বাদশাহ! আমাদের ধর্মের নাম ‘ইসলাম’। আমরা স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করি এবং তার সাথে কাউকে শরীক করি না।

বাদশাহ বললেন, কে তোমাদের এসব কথা শিখিয়েছেন?

জাফর বললেন, আমাদের মধ্যকারই একজন ব্যক্তি। ইতিপূর্বে আমরা মূর্তিপূজা ও অশ্লীলতা এবং অন্যায় ও অত্যাচারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলাম এবং আমরা শক্তিশালীরা দুর্বলদের শোষণ করতাম। এমতাবস্থায় আল্লাহ মেহেরবানী করে আমাদের মধ্যে তাঁর শেষনবীকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর নাম ‘মুহাম্মাদ’। তিনি আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছেন। তাঁর বংশ মর্যাদা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারী, সংযমশীলতা, পরোপকারিতা প্রভৃতি গুণাবলী আমরা জানি। নবুঅত লাভের পর তিনি আমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে সর্বাবস্থায় এক আল্লাহর ইবাদত করার আহবান জানিয়েছেন। সাথে সাথে যাবতীয় অন্যায়-অপকর্ম হ’তে তওবা করে সৎকর্মশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং এক আল্লাহর ইবাদত করছি ও হালাল-হারাম মেনে চলছি। এতে আমাদের কওমের নেতারা আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং আমাদের উপর প্রচন্ড নির্যাতন চালিয়েছেন। সেকারণ বাধ্য হয়ে আমরা সবকিছু ফেলে আপনার রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছি আপনার সুশাসনের খবর শুনে। আমরা অন্যস্থান বাদ দিয়ে আপনাকে পছন্দ করেছি এবং আপনার এখানেই আমরা থাকতে চাই। আশা করি আমরা আপনার নিকটে অত্যাচারিত হব না’। সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৩৩৬।

অতঃপর জাফর বললেন, হে বাদশাহ! অভিবাদন সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আমাদের জানিয়েছেন যে, জান্নাতবাসীদের পরস্পরে অভিবাদন হ’ল ‘সালাম’ এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে পরস্পরে ‘সালাম’ করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

বাদশাহ বললেন, ঈসা ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে তোমরা কি বলতে চাও?

উত্তরে জা‘ফর বিন আবু ত্বালিব সূরা মারিয়ামের শুরু থেকে ৩৬ আয়াত পর্যন্ত হযরত যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া (আঃ)-এর বিবরণ, মারিয়ামের প্রতিপালন, ঈসার জন্মগ্রহণ ও লালন-পালন, দোলনায় কথোপকথন প্রভৃতি আয়াতগুলি পাঠ করে শুনিয়ে দিলেনঃ

কাফ-হা-ইয়া-আইন-সাদ। এটা আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তাঁর পালনকর্তাকে আহবান করেছিল নিভৃতে।
সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা আমার অস্থি বয়স-ভারাবনত হয়েছে; বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে; হে আমার পালনকর্তা! আপনাকে ডেকে আমি কখনও বিফলমনোরথ হইনি। আমি ভয় করি আমার পর আমার স্বগোত্রকে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; কাজেই আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে এক জন কর্তব্য পালনকারী দান করুন। সে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে ইয়াকুব বংশের এবং হে আমার পালনকর্তা, তাকে করুন সন্তোষজনক।
হে যাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম হবে ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে এই নামে আমি কারও নাম করণ করিনি।

সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা কেমন করে আমার পুত্র হবে অথচ আমার স্ত্রী যে বন্ধ্যা, আর আমিও যে বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে উপনীত।

তিনি বললেনঃ এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলে দিয়েছেনঃ এটা আমার পক্ষে সহজ। আমি তো পুর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি এবং তুমি কিছুই ছিলে না।
সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে একটি নির্দশন দিন।
তিনি বললেন তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ অবস্থায় তিন দিন মানুষের সাথে কথাবার্তা বলবে না।
অতঃপর সে কক্ষ থেকে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে এল এবং ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল সন্ধ্যায় আল্লাহকে স্মরণ করতে বললঃ হে ইয়াহইয়া দৃঢ়তার সাথে এই গ্রন্থ ধারণ কর। আমি তাকে শৈশবেই বিচারবুদ্ধি দান করেছিলাম।
এবং নিজের পক্ষ থেকে আগ্রহ ও পবিত্রতা দিয়েছি। সে ছিল পরহেযগার। পিতা-মাতার অনুগত এবং সে উদ্ধত, নাফরমান ছিল না। তার প্রতি শান্তি-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এবং যেদিন মৃত্যূবরণ করবে এবং যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।
এই কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করুন, যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। অতঃপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করলো। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পুর্ণ মানবাকৃতিতে আত্নপ্রকাশ করল।
মারইয়াম বললঃ আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহ্‌ভীরু হও।
সে বললঃ আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তা প্রেরিত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব।
মারইয়াম বললঃ কিরূপে আমার পুত্র হবে, যখন কোন মানব আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও কখনও ছিলাম না ?
সে বললঃ এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্যে সহজ সাধ্য এবং আমি তাকে মানুষের জন্যে একটি নিদর্শন ও আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ করতে চাই। এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার।
অতঃপর তিনি গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন এবং তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন।
তিনি বললেনঃ হায়, আমি যদি কোনরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে, যেতাম! প্রসব বেদনা তাঁকে এক খেজুর বৃক্ষ-মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল।
অতঃপর ফেরেশতা তাকে নিম্নদিক থেকে আওয়ায দিলেন যে, তুমি দুঃখ করো না। তোমার পালনকর্তা তোমার পায়ের তলায় একটি নহর জারি করেছেন। আর তুমি নিজের দিকে খেজুর গাছের কান্ডে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার উপর সুপক্ক খেজুর পতিত হবে। আহার কর, পান কর এবং চক্ষু শীতল কর। যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখ, তবে বলে দিওঃ আমি আল্লাহ্‌র উদ্দেশে রোযা মানত করছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে কথা বলব না। অতঃপর তিনি সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন।
তারা বললঃ হে মারইয়াম, তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারূণ-ভাগিনী, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিনী।
অতঃপর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তারা বললঃ যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?
সন্তান বললঃ আমি তো আল্লাহ্‌র দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন।
আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে এবং জননীর অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি।
আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যূবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।
এই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্যকথা, যে সম্পর্কে লোকেরা বিতর্ক করে। আল্লাহ্‌ এমন নন যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, তিনি যখন কোন কাজ করা সিদ্ধান্ত করেন, তখন একথাই বলেনঃ হও এবং তা হয়ে যায়।

তিনি আরও বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তার এবাদত কর। এটা সরল পথ।  
বাদশাহ ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং তাওরাত-ইঞ্জীলে পন্ডিত ব্যক্তি। কুরআনের অপূর্ব বাকভঙ্গি, শব্দশৈলী ও ভাষালংকার এবং ঘটনার সারবত্তা উপলব্ধি করে বাদশাহ অঝোর নয়নে কাঁদতে থাকলেন। সাথে উপস্থিত পাদ্রীগণও কাঁদতে লাগলো। তাদের চোখের পানিতে তাদের হাতে ধরা ধর্মগ্রন্থগুলি ভিজে গেল। অতঃপর নাজ্জাশী বলে উঠলেন, إن هذا والذى جاء به عيسى ليخرج من مشكاة واحدة- ‘নিশ্চয়ই এই কালাম এবং ঈসার নিকটে যা নাযিল হয়েছিল দু’টিই একই আলোর উৎস হ’তে নির্গত’। বলেই তিনি কুরায়েশ দূতদ্বয়ের দিকে ফিরে বললেন, انطلقا فلا والله لا أسلمهم- ‘তোমরা চলে যাও! আল্লাহর কসম! আমি কখনোই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না’।

আমর ইবনুল ‘আছ এবং আব্দুল্লাহ বিন আবী রাবী‘আহ দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমর বললেন, কালকে এসে এমন কিছু কথা বাদশাহকে শুনাবো, যাতে এদের মূলোৎপাটন হয়ে যাবে এবং এরা ধ্বংস হয়ে যাবে। একথা শুনে আব্দুল্লাহ বললেন, না, না এমন নিষ্ঠুর কিছু করবেন না। ওরা আমাদের স্বগোত্রীয় এবং নিকটাত্মীয় তো বটেই। কিন্তু আমর ওসব কথায় কর্ণপাত করলেন না।
পরের দিন বাদশাহর দরবারে এসে তিনি বললেন, أيها الملك إنهم يقولون فى عيسى بن مريم قولا عظيما- ‘হে সম্রাট! এরা ঈসা ইবনে মারিয়াম সম্পর্কে ভয়ংকর সব কথা বলে থাকে’। একথা শুনে বাদশাহ মুসলমানদের ডাকালেন। মুসলমানেরা একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। কেননা নাছারারা ঈসাকে উপাস্য মানে। কিন্তু মুসলমানরা তাকে আল্লাহর বান্দা বলে থাকে।

যাই হোক কোনরূপ দ্বৈততার আশ্রয় না নিয়ে সত্য বলার ব্যাপারে তারা মনস্থির করলেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সত্য প্রকাশ করে দিয়ে জাফর বিন আবু তালিব বললেন, هو عبد الله ورسوله و روحه وكلمته ألقاها إلى مريمَ العَذْراءِ الْبَتُولِ ولم يَمَسُّها بَشَرٌ- ‘তিনি ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি ছিলেন আল্লাহ প্রেরিত রূহ এবং তাঁর নির্দেশ। যা তিনি মহীয়সী কুমারী মাতা মারিয়ামের উপরে ফুঁকে দিয়েছিলেন। কোন পুরুষ লোক তাকে স্পর্শ করেনি’।

তখন নাজ্জাশী মাটি থেকে একটা কাঠের টুকরা উঠিয়ে বললেন, والله ماعدا عيسى بن مريمَ ما قلتَ هذا العودَ ‘আল্লাহর কসম! তুমি যা বলেছ, ঈসা ইবনে মারিয়াম তার চাইতে এই কাষ্ঠখন্ড পরিমাণও বেশী ছিলেন না’।

তিনি একথাও বলেন যে, أشكر الله بأنى وجدتُ زَمَنَ هذا الرسولِ ‘আল্লাহর শোকর যে, আমি এই রাসূলের যামানা পেয়েছি’। রাহমাতুল লিল আলামীন ১/৫৯।  

তিনি জাফর ও তার সাথীদের উদ্দেশ্যে বললেন, إذهبوا فأنتم شيُّومٌ بأرضى، من سبَّكم غَرِمٌ، من سبَّكم غَرِمٌ، من سبَّكم غَرِمٌ، ما أُحِبُّ أَنَّ لى دَبْرًا من ذهب وأنى آذيتُ رجلا منكم- ‘যাও! তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ। যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দেবে, তার জরিমানা হবে। যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দেবে, তার জরিমানা হবে। যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দেবে, তার জরিমানা হবে। তোমাদের কাউকে কষ্ট দেওয়ার বিনিময়ে যদি কেউ আমাকে স্বর্ণের পাহাড় এনে দেয়, আমি তা পছন্দ করব না’।

অতঃপর তিনি কুরায়েশ দূতদ্বয়ের প্রদত্ত উপঢৌকনাদি ফেরৎ দানের নির্দেশ দিলেন।ঘটনার বর্ণনাদানকারিণী হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ) (পরবর্তীকালে উম্মুল মুমেনীন) বলেন, فخرجا من عنده مقبوحَين... وأقمنا عنده بخير دار مع خيرجار ‘ঐ দু’জন চরম বেইযযতির সাথে দরবার থেকে বেরিয়ে গেল... এবং আমরা উত্তম প্রতিবেশীর সাথে উত্তম গৃহবাসীরূপে বসবাস করতে থাকলাম’।

ফালিল্লাহিল হাম্দ। আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) বলেন, তাঁরা শেষনবীর আবির্ভাবের খবর শুনে ৫০-এর অধিক লোক নিয়ে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে ইয়ামন থেকে নৌকায় মদীনা রওয়ানা হন। কিন্তু ঝড়ে তাদের নৌকা হাবশায় গিয়ে নোঙর করে। ফলে তারা সেখানে অবতরণ করেন এবং জাফর ও তার সাথীদের সঙ্গে সাক্ষাত হলে তারা সেখানেই থেকে যান। পরে জাফরের সাথে তারা ৭ম হিজরীতে খায়বরে এসে রাসূলের নিকট হাযির হন। ফলে জাফর ও নাজ্জাশীর মধ্যকার আলোচনার সময় আবু মূসা আশ‘আরী উপস্থিত ছিলেন।
বুখারী, মুসলিম, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৩/৬৪-৭২।

be Organized by Holy Islam 

O.H.I 

For More Visit:





Saturday, June 25, 2011

মু’মিন হতে যা দরকার


السلام عليكم
দৈনন্দিন পথনির্দেশিকা

মু’মিন হতে যা দরকার

আলী (রা) বর্ণিত;
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন বান্দাহ মু’মিন হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত চারটি জিনিসের উপর ঈমান না আনবেঃ

১.  সে সাক্ষী দিবে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।
২.  নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ দ্বীনে হাক্ব দিয়ে আমাকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন,
৩.  মৃত্যূ ও মৃত্যূর পরে হাশরের ময়দানে উঠার উপর ঈমান আনা এবং
৪.  তাকদ্বীরের উপর ঈমান আনা।

[তিরমিযী ২১৪৫ ইবনু মাজাহ ৮১ মিশকাতুল মাসাবীহ হাদীস নং ১০৪]



be Organized by Holy Islam 

O.H.I 

For More Visit:

Wednesday, June 22, 2011

রজব নিয়ে অলীক ভাবনা


السلام عليكم
দৈনন্দিন পথনির্দেশিকা
রজব নিয়ে অলীক ভাবনা


বলা যায়, মুসলমান মাত্রই অবগত যে, আল্লাহ যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন তার মধ্যে একটি হল রজব মাস, যা হিজরি সনের সপ্তম মাস। এ চার মাস সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ (التوبة :36)
অবশ্যই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারটি, তার মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। এ সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং, এতে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করবে না। (সূরা তাওবা : ৩৬)
বোখারি ও মুসলিম বর্ণিত হাদিসে এসেছে , নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন :
إن الزمان قد استدار كهيئته يوم خلق الله السماوات والأرض، السنة اثنا عشر شهرا، منها أربعة حرم، ثلاث متواليات : ذو القعدة، ذو الحجة، والمحرم، ورجب مضر الذي بين جمادى وشعبان.
যে দিন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে সে দিন থেকেই সময় তার নিজ আবর্তে ঘুরে ঘুরে চলছে। বছর হল বারোটি মাসে। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত (নিষিদ্ধ)। এর তিনটি হল ধারাবাহিক ; জিলকদ, জিলহজ ও মুহররম আর চতুর্থটি হল মুদার বংশের রজব। যা জমাদিউসসানী ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী।
মাস চতুষ্টয়কে সম্মানিত হিসেবে নাম করার কারণ :
এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। বলা হয় যে, এ সকল মাসের সম্মানের কারণে এবং এ সকল মাসে পাপ কাজ অপেক্ষাকৃত গুরুতর হওয়ার কারণে এ মাসসমূহকে নিষিদ্ধ বা সম্মানিত মাস হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।
ইবনে আবি তালহা, ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন : আল্লাহ তাআলা চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন, নিষিদ্ধ মাস বলে ঘোষণা দিয়েছেন, এ সকল মাসে পাপ কাজকে অধিকতর অন্যায় এবং সৎকর্ম অধিকতর পুরস্কার লাভের মাধ্যম বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অনেকের মত হল-এ চার মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে এর নাম হুরুম বা নিষিদ্ধ মাস বলে নাম রাখা হয়েছে।
রজব মাসের নাম রজব কেন ?
ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, রজব মানে সম্মান করা।
জাহেলি যুগে রজব মাসের সম্মান :
জাহেলি যুগের মানুষ রজব মাসকে সম্মান করত, বিশেষ করে মুদার বংশের লোকেরা। এ জন্য অনেকে বলত মুদার বংশের রজব। এ পরিভাষা হাদিসেও এসেছে।
ইবনে আসীর আন-নিহায়া গ্রন্থে বলেন, রজবকে মুদার বংশের সাথে সম্পর্কিত করা হয় এ কারণে যে তারা অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ মাসকে বেশি মর্যাদা দিত। এ মাসে যুদ্ধ করাকে নিষিদ্ধ বলে জানত। এ মাসে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল-তারা সে যুদ্ধকে হরবুল ফুজ্জার (পাপীদের যুদ্ধ) বলে আখ্যায়িত করেছিল এবং উক্ত যুদ্ধ ইতিহাসে এ নামেই পরিচয় পেয়েছে।
তারা বিশ্বাস করত, রজব মাসের দশ তারিখে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দুআ করলে তা কবুল করা হয়। এবং বাস্তবে দুআ কবুলও হত। এ বিষয়টি উমার ইবনে খাত্তাবের কাছে আলোচিত হলে তিনি বললেন, আল্লাহ এর মাধ্যমে তাদের একজনকে অন্যজন থেকে নিরাপত্তা দিতেন। আসলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতকে তাদের শাস্তির চূড়ান্ত সময় হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। কিয়ামত হবে কঠিনতর ও তিক্ততায় ক্লিষ্ট।
জাহেলি যুগের মানুষ রজব মাসে প্রতিমা ও তাদের দেব-দেবীদের উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করত এবং এ পশুর রক্ত তারা মাথায় মাখত। এটাকে বলা হত আতীরা’। পরবর্তীতে ইসলাম একে নিষিদ্ধ করেছে।
আনাস ইবনে মালেক বর্ণিত হাদিসে এসেছে -
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا دخل رجب قال: أللهم بارك لنا في رجب وشعبان وبلغنا رمضان. وإسناده ضعيف
যখন রজ মাস এসে যেত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, হে আল্লাহ আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করেন এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। এ হাদিসটি সনদ-সূত্রে দুর্বল।
রজব মাসে প্রচলিত বেদআত ও কুসংস্কারসমূহ:
আশ্চর্যের বিষয় হল মানুষ এ মাসে বিভিন্ন বেদআতি আমল চালু করেছে। যে সম্পর্কে ইসলামে কোন নির্দেশনা নেই। এ সকল বিষয়ে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ইবনুল কায়্যিম রহ. ইমাম শাতেবী, ইবনে রজব হাম্বলী রহ. তারতুশী রহ. ও ইবনে হাজার রহ. প্রমুখ আলেমগণ সতর্ক করেছেন। আমি তাদের লেখাগুলো থেকেই এ বিষয় কিছু আলোচনা করব।
বর্তমান যুগের শায়খ আলী মাহফুজ, শায়খ ইবনে বায, শায়খ আলবানী, শায়খ উসাইমীন, ও শায়খ ফাওযান প্রমুখ আলেমগণও সতর্ক করেছেন। সমাজে রজব মাস সম্পর্কে যে সকল কুসংস্কার ও বেদআত রয়েছে তার মাঝে অন্যতম -
প্রথমত : বেদআতি নামাজ :
১-সালাতুল আলফিয়্যাহ বা এক সহস্র নামাজ : এ নামাজ রজব মাসের প্রথম তারিখে এবং শাবান মাসের পনেরো তারিখের রাতে পড়া হয়।
২-সালাতে উম্মে দাউদ : যা পড়া হয় রজব মাসের পনেরো তারিখে। এর কথা ইমাম ইবনু তাইমিয়া ইকতেজায়ে সিরাতিল মুসতাকিম কিতাবে উল্লেখ করেছেন।
৩-সালাতুর রাগায়েব-যাকে সালাতে ইসনা আশারা (বারো নামাজ) বলেও অবিহিত করা হয় ; যা রজব মাসের প্রথম জুমআর রাতে এশার পর পড়া হয়। এটি এমন এক বেদআতি সালাত যা আবিষ্কার করা হয়েছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চারশত বছর পর। প্রত্যেক রাকাআতে সূরা ফাতেহা একবার, সূরা কদর তিনবার ও সুরা ইখলাস বারো বার করে এক সালামে পড়া হয়।এর কথা ইবনে রজব রহ. তার লাতায়েফুল মাআরিফ কিতাবে আলোচনা করেছেন।
দ্বিতীয়ত : বেদআতি রোজা
১-কেউ কেউ রজব মাসের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন এ রোজা পালন করে। রজব মাসের রোজা সম্পর্কিত যত হাদিস এসেছে তার সবগুলোই বানোয়াট। এর কয়েকটি এ রকম -
(ক) যে সম্মানিত মাসের বৃহস্পতি, শুক্র, ও শনি-এ তিন দিনের রোজা রাখবে আল্লাহ তার জন্য নয় শত বছরের ইবাদত লিখে রাখবেন।
(খ) রজব মাসের প্রথম তারিখ রোজা রাখলে তিন বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। দ্বিতীয় দিনে রোজা রাখলে দুই বছরের কাফফারা ও এর পর প্রতিটি রোজা এক মাসের কাফফারা বলে ধরে নেয়া হয়।
(গ) রজব আল্লাহর মাস, ও শাবান আমার মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস।
উপরের এ তিনটি হাদিসই মিথ্যা, জাল বা বানোয়াট।
আবার কেউ রজব মাসের সপ্তম তারিখে রোজা পালন করে এবং এ রাতে সালাতুর রাগায়েব আদায় করে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন রজব মাসের সম্মানে যে সকল রোজা ও নামাজ আদায় করা হয় সবগুলো নব-আবিষ্কৃত বা বেদআত। এ গুলোর ব্যাপারে আলেমগণ নিষেধ করেছেন কাঠোরভাবে।
কেউ কেউ পুরো রজব মাসে রোজা রাখেন। এও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কখনো রজব মাস-ব্যাপী রোজা পালন করেননি।
ইমামগণ রজব মাস ব্যাপী রোজা পালন করতে নিষেধ করেছেন। উমার রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রজব মাসে কাউকে রোজা রাখতে দেখলে তিনি তকে প্রহার করে খাবার গ্রহণ করতে বাধ্য করতেন। এবং বলতেন, রজব আবার কি? জাহেলি যুগে রজব মাসকে সম্মান করা হত ; ইসলাম তা প্রত্যাখ্যান করেছে।’ তিনি এ মাসে রোজা রাখাকে মাকরূহ মনে করতেন।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে-তিনি রজব মাসের রোজা রাখতে নিষেধ করতেন।
আবু বুকরাতা রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি একদিন দেখলেন তার পরিবার রজব মাসে রোজা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি তা দেখে বললেন, তোমরা কি রজবকে রমজান বানাতে যাচ্ছ ?
হাফেজ ইবনে হাজার তার তাবয়ীনুল আজব বিমা ওয়ারাদা ফি ফজলে রজব’ নামক কিতাবে বলেন রজব মাসের ফজিলত, তার রোজা ও বিশেষ নামাজ সম্পর্কে কোন বিশুদ্ধ হাদিস নেই।
তৃতীয়ত: রজব মাসে মসজিদে নববী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রওজা জিয়ারত :
মসজিদে নববী জিয়ারত ও এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা জিয়ারত অবশ্যই সওয়াবের কাজ-সন্দেহ নেই। কিন্তু তা রজব মাসে করলে সওয়াব বেশি হবে এমন ধারণা করা ঠিক নয়। কোরআন ও সুন্নাহর সহিহ প্রমাণাদি ব্যতীত কোন অনুমোদিত ইবাদত কোন সময় বা দিনের সাথে বিশিষ্ট করা বেদআত। যে সময়কে আল্লাহ বা তার রাসূল কোন ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করেননি তা অন্য কেহ করলে অবশ্যই বেদআত হবে। (আহকামূল জানায়েজ ও বিদউহা : আলবানী)
চতুর্থত: লাইলাতু মিরাজ উদযাপন :
রজব মাসের সাতাশ তারিখের রাতে লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন করা হয়ে থাকে। ধারণা করা হয় এ রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজে গমন করেছিলেন। লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন বেদআত। এটা উদযাপন করা জায়েজ নেই। কারণ কয়েকটি :
এক. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন তারিখে মিরাজে গমন করেছিলেন এ বিষয়ে কোন চূড়ান্ত তারিখের ব্যাপারে ইমাম ও আলেম উলামাদের কোন ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মিরাজের তারিখ সম্পর্কে রয়েছে বহু মত। ঠিক কোন রাতে মিরাজ সংগঠিত হয়েছিল এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ নেই। এমনকি তা রজব মাসে হয়েছিল কিনা এ বিষয়েও রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক।
দুই. যদি ধরে নেয়া হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিরাজ রজব মাসের সাতাশ তারিখেই সংগঠিত হয়েছিল তবুও তো এ রাতে লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন জায়েজ হবে না। কারণ লাইলাতুল মিরাজ উদযাপনের বিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে সমর্থিত নয়। এমনকি তার সাহাবায়ে কেরাম ও তাবিয়ীদের থেকেও নয়। যা আল্লাহ বা তাঁর রাসূল থেকে সমর্থিত নয় তা ইবাদত হিসাবে উদযাপন করা সওয়াব তো নয়ই বরং গুনাহের কাজ।
এ রাতে উপলক্ষ করে মসজিদে জমায়েত হওয়া, বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা, মিলাদ মাহফিল, রোজা পালন, আলোকসজ্জা-ইত্যাদি সকল কর্মকাণ্ডই বেদআত। এগুলো থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আমি পাঠকের অবগতির জন্য সাউদী আরবের প্রধান মুফতি শায়খ আব্দুল আযীয আব্দুল্লাহ বিন বায রহ.-এর ফতোয়া উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। তিনি তার ফতোয়াতে বলেন:
লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন সম্পর্কে কোন সহিহ হাদিস নেই। রজব মাসের ব্যাপারেও নয়, এর বাহিরেও নয়। মিরাজের তারিখ নির্ধারণের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোন কিছুই প্রমাণিত নেই।
আল্লাহ যে মানুষকে মিরাজের তারিখ সংরক্ষণ করার সামর্থ্য দেননি এর মাঝে অবশ্যই কোন হিকমত ও কল্যাণ রয়েছে। যদি তারিখটি সংরক্ষিত থাকত তবুও কি ইবাদত-বন্দেগির এমন কিছু করা জায়েজ হত যা আল্লাহ বা তাঁর রাসূল করতে বলেননি, তার সাহাবাগণ করেননি ? যদি লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন ভাল কাজ হতো তবে আল্লাহর রাসূল অবশ্যই করতেন বা করতে বলে যেতেন অথবা, নিদেনপক্ষে, অনুমোদন প্রদান করতেন। এবং তিনি কোন একটি পালন করে গেলে তার সাহাবায়ে কেরাম তা অবশ্যই আমাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তারা রাসূলুল্লাহর বাণী পৌঁছে দিতে কোন ধরনের কার্পণ্য করেছেন-এমন নজির নেই। তারা ইসলাম ধর্মের সকল বিষয়ে যত্ন সহকারে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। যদি লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন ধর্মীয় কোন কাজ হত তবে তারা তা উদযাপনে আমাদের চেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন।
সারকথা: বেদআত ধর্মকে বিকৃত করার একটি মারাত্মক হাতিয়ার। এবং মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করার একটি বড় মাধ্যম। আল্লাহ যাকে সামর্থ্য দান করেন সেই বেঁচে থাকতে পারে এ ব্যাধি থেকে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে ইখলাস অনুযায়ী এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে ইবাদত-বন্দেগি সহ সকল কাজ করার তাওফিক দান করুন!
ওয়েব গ্রন্থনা : আবুল কালাম আযাদ আনোয়ার


বিস্তারিত পড়ুনঃ